এক বছর আগে সাংহাই মাস্টার্সে খেলতে নামার সময় ভাশেরোর ATP র্যাঙ্কিং ছিল মাত্র ২০৪, ক্যারিয়ারে ট্যুরের মূল পর্বে জয় ছিল মাত্র ১টি। হার্ড কোর্টের এই টুর্নামেন্টের বাছাইপর্বে মোনাকোর এই খেলোয়াড় একসময় বিদায় থেকে মাত্র ২ পয়েন্ট দূরে ছিলেন, কিন্তু অল্পের জন্য তিনি মূল পর্বে জায়গা করে নেন এবং এরপর টানা জিততে থাকেন। জেরে, বুবলিক, মাখাচ, গ্রিকস্পুর ও রুনে সবাই তাঁর কাছে হেরে যান। এরপর তিনি জোকোভিচ এবং নিজের মামাতো ভাই রিন্ডারনেশকেও হারিয়ে মাস্টার্সের ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্ময়কর ডার্ক হর্স যাত্রা রচনা করেন।

দুই সপ্তাহের টুর্নামেন্ট শেষে ভাশেরো মূল পর্বে ৭টি জয় তুলে নিয়ে মাস্টার্স শিরোপা জেতেন। ২৭ বছর বয়সী এই খেলোয়াড় এই পর্যায়ের টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বনিম্ন র্যাঙ্কিংয়ের চ্যাম্পিয়ন হন, এবং একই সঙ্গে ওপেন যুগে ট্যুরের শিরোপা জেতা প্রথম মোনাকোর খেলোয়াড়ও হন।
এক বছর পর ভাশেরো ফিরেছেন সেই কোর্টে, যেখানে তাঁর ক্যারিয়ারের শিখর রচিত হয়েছিল। এখন তাঁর র্যাঙ্কিং ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ১৪-এ, তিনি শিরোপা রক্ষার যাত্রা শুরু করতে চলেছেন, প্রথম রাউন্ডে প্রতিপক্ষ বায়েজ। সাংহাইয়ে ফেরার আগে ভাশেরো ও তাঁর কোচ বালেরে তাঁর ক্যারিয়ার বদলে দেওয়া সেই টুর্নামেন্টের স্মৃতিচারণ করেন, আর প্রথমেই কথা ওঠে জোকোভিচের বিপক্ষে সেই চমকপ্রদ সেমিফাইনাল নিয়ে।
“আমার সবসময় অদ্ভুত লাগে, কারণ জোকোভিচের বিপক্ষে ম্যাচটাই ছিল একমাত্র ম্যাচ যেখানে প্রায় সব দিকেই আমি নিখুঁত খেলেছি। তিন সেট খেলতে হয়নি, পুরো ম্যাচে কখনো পিছিয়ে পড়িনি, কোনো ব্রেক পয়েন্টও বাঁচাতে হয়নি।” আবেগভরে স্মরণ করেন ভাশেরো।
ভাশেরো ৬-৩/৬-৪ ব্যবধানে জোকোভিচকে হারান, সেই সপ্তাহে এটি ছিল শীর্ষ দশের কোনো খেলোয়াড়ের বিপক্ষে তাঁর দ্বিতীয় জয়, এর আগে তিনি রুনেকে হারিয়েছিলেন। ওই ম্যাচের বেশিরভাগ সময় সার্বিয়ান তারকার শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল না, কিন্তু বালেরে জানতেন, জোকোভিচ কখনোই সহজে হাল ছাড়েন না।
“ম্যাচটা কঠিন ছিল। প্রথম সেট জেতার সময় মনে হচ্ছিল নোভাক হয়তো ম্যাচ ছেড়ে দিতে পারেন, কিন্তু আপনি জানেন তিনি তা করবেন না, তিনি জোকোভিচ, শেষ পর্যন্ত লড়বেন। শুধু কোর্টের পরিস্থিতি বিচার করা খুব কঠিন ছিল।” বলেন বালেরে।
ভাশেরো জোকোভিচের শারীরিক অবস্থা খেয়াল করেছিলেন এবং পুরো ম্যাচে শ্রদ্ধার সঙ্গে খেলেছেন। ম্যাচের পর জোকোভিচ তাঁকে কিছু উৎসাহের কথা বলেন, যা তাঁর মনে গভীর দাগ কাটে।
“তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে আমি তাঁকে খুব শ্রদ্ধা করি, কারণ পুরো ম্যাচেই আমি দেখছিলাম তাঁর শরীর খুব কষ্ট পাচ্ছে। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে জয় উদযাপন করিনি। চুপচাপ তাঁর কথা শুনেছি, তিনি আমাকে বলেছিলেন, এই জয় পুরোপুরি আমার, শুধু জয়টা উপভোগ করলেই হবে। তিনি খুবই ভালো মানুষ।” বলেন ভাশেরো।
এই জয় ভাশেরোকে তাঁর প্রথম মাস্টার্স ফাইনালে পৌঁছে দেয়। নেটের অপর প্রান্তে অপেক্ষা করছিলেন তাঁর মামাতো ভাই রিন্ডারনেশ, তখন যাঁর বিশ্ব র্যাঙ্কিং ছিল ৫৪। রিন্ডারনেশও চমকপ্রদভাবে এগিয়ে এসেছিলেন, পরপর জভেরেভ ও মেদভেদেভকে হারিয়ে তিনি এমন এক পারিবারিক দ্বৈরথ তৈরি করেন, যা দুই সপ্তাহ আগে দুজনে সাংহাইয়ে পৌঁছানোর সময় কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
দুই ভাই ২০১৮ সালে একসঙ্গে টেক্সাস এএন্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও খেলাধুলা করেছেন, তবে তাঁদের সম্পর্ক আরও পুরোনো, ছোটবেলায় ভাশেরোর বাড়ির বাগানে টেনিস খেলার দিনগুলো পর্যন্ত তার শিকড় বিস্তৃত।
“আর্তুর আর আমি আসলে টেক্সাস এএন্ডএম-এ যাওয়ার পরই একসঙ্গে টেনিস খেলতে শুরু করি। আগে আমরা খুব কমই একে অপরের সঙ্গে খেলেছি, ছুটির দিনগুলো বেশিরভাগ একসঙ্গে খেলাধুলা করে কাটাতাম। তবে আর্তুর আমাকে মনে করিয়ে দেয়, সম্ভবত আমার ৮ বছর আর ওর ১১ বছর বয়সে আমরা আমার বাবা-মায়ের বাড়ির বাগানে খেলতাম, আর ভান করতাম যে সেটা উইম্বলডনের ফাইনাল।” বলেন ভাশেরো।
বহু বছর পর শৈশবের সেই খেলা সত্যিকারের মাস্টার্স শিরোপার লড়াইয়ে পরিণত হয়। শিরোপা কার হাতে যাবে তা সুতোয় ঝুললেও দুজনের ঘনিষ্ঠতা অটুট ছিল। ফাইনালের আগে তাঁরা একসঙ্গে ওয়ার্ম আপ করেন, ভাশেরোর কাছে এটা ছিল সবচেয়ে স্বাভাবিক ব্যাপার।
“আর্তুর আমাকে জিজ্ঞেস করল: ‘একসঙ্গে ওয়ার্ম আপ করবে?’ আমি বললাম অবশ্যই।” স্মরণ করেন ভাশেরো।
বালেরে যোগ করেন: “একসঙ্গে ওয়ার্ম আপ না করলেই বরং অদ্ভুত লাগত। একই কোর্টে তো তাঁরা এমনিতেই একে অপরের অনুশীলন সঙ্গী। তা ছাড়া দুজনেই একে অপরকে ভালোভাবে চেনেন, সাতটি ম্যাচ খেলার পর বেশি তীব্র ওয়ার্ম আপের দরকারও নেই।”
কোর্টের বাইরের এই স্বস্তি কোর্টে শিরোপার লড়াইয়ের তীব্র চাপের সঙ্গে স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করে। ভাশেরো বাছাইপর্বের খেলোয়াড় হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন, র্যাঙ্কিং ছিল ২০০-র বাইরে, মাস্টার্সের ফাইনালে ওঠাটাই ছিল প্রায় অকল্পনীয়। ভাশেরোর মতে, ট্যুরের প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর মামাতো ভাই এই সুযোগকে তাঁর চেয়ে ভিন্ন মানসিকতায় দেখছিলেন।
“আমার কাছে এটা ছিল অনেকটা সুন্দর স্বপ্নের মতো। আর্তুরও ফাইনালে দাঁড়ানোর যোগ্য, শুধু ওর ক্ষেত্রে এটা ঘটার সম্ভাবনা বেশি ছিল।” ভাশেরো বলেন, “আর্তুরের ওপর চাপ ছিল বেশি। কারণ আমার ফাইনালে ওঠাটা ওর চেয়ে অনেক বেশি অপ্রত্যাশিত ছিল। আর্তুর যেকোনো মাস্টার্সেই এতদূর আসার সুযোগ রাখে। আর আমার র্যাঙ্কিং তখন ছিল ২০০। আমি হেরে গেলেও ওর জন্য মন থেকে খুশি হতাম। অবশ্যই ও-ও আমার জন্য খুশি ছিল, কিন্তু আমার মনে হয় ফাইনাল হারার মূল্য ওর জন্য আমার চেয়ে বেশি ছিল।”
শেষ পর্যন্ত ভাশেরো ৪-৬/৬-৩/৬-৩ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়িয়ে জেতেন, এবং ইতিহাসে তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে বাছাইপর্বের খেলোয়াড় হয়ে মাস্টার্স শিরোপা জেতেন।
এই অর্জন যথেষ্ট কিংবদন্তিতুল্য, কিন্তু মামাতো ভাই রিন্ডারনেশের সঙ্গে গভীর বন্ধন এই শিরোপা জয়ের মুহূর্তটিকে সাধারণ চ্যাম্পিয়নশিপ উদযাপন থেকে আলাদা করে তোলে।
শিরোপা জয়ের মুহূর্ত স্মরণ করে ভাশেরো বলেন: “প্রতিপক্ষ অন্য কেউ হলে জয়ের মুহূর্তে আমি নিশ্চয়ই আবেগে মাটিতে লুটিয়ে পড়তাম।”
আনন্দ ও সহমর্মিতার মিশ্র অনুভূতি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়ে। ভাশেরো একসঙ্গে পেরিয়ে আসা সেই দুই সপ্তাহের যাত্রার কথা ভাবছিলেন, আর রিন্ডারনেশ তাঁকে এই জীবনের অবিস্মরণীয় মুহূর্তে উত্তেজনা কাটাতে সাহায্য করেন।
“আমরা একে অপরকে অনেক আন্তরিক কথা বলেছি। আমার টেনিস ক্যারিয়ারের একটা অংশের কৃতিত্ব ওর। বক্তব্য দেওয়ার সময় আমি একটু নার্ভাস ছিলাম, ও-ই আমাকে স্বস্তি দিয়েছে। আমি শিরোপা জেতার স্বপ্ন দেখেছিলাম, কিন্তু ম্যাচের আগে একেবারেই ভাবিনি। কেউ কেউ বলে ছোটবেলায় গোসলের সময় পুরস্কার গ্রহণের বক্তব্য অনুশীলন করত, আমি কখনো করিনি। আমার মনে হয় তখন আমি বেশ ভালোই বলেছিলাম।”
ম্যাচের চাপ ছাড়াও এই যাত্রায় ভাশেরোর পাশে ছিল একটি ছোট, ঘনিষ্ঠ দল। কোচ বালেরে ছাড়াও এতে ছিলেন তাঁর বান্ধবী স্নাইডার, এমনকি ফাইনালে মুখোমুখি হওয়ার আগে মামাতো ভাই রিন্ডারনেশও এই ছোট বৃত্তের অংশ ছিলেন।
“আমাদের যেন একটা ছোট্ট বদ্ধ বৃত্ত ছিল: বালেরে, আমি, এমিলি আর আর্তুর। পুরো দুই সপ্তাহ আমরা প্রায় সবসময় একসঙ্গে ছিলাম। ম্যাচ বা অনুশীলন না থাকলে একসঙ্গে রাতের খাবার খেতাম। সত্যি বলতে বান্ধবীর আসার পরিকল্পনা ছিল না, কিন্তু টুর্নামেন্টের পর আমাকে টানা অনেকদিন খেলতে হবে, দীর্ঘ সময় বাড়ি ফিরতে পারব না, এসব ভেবে শেষে ওকে আসতে বলার সিদ্ধান্ত নিই।” বলেন ভাশেরো।
এই সমর্থন সেই অবিশ্বাস্য দুই সপ্তাহকে আরও স্বস্তিদায়ক করে তুলেছিল। সাংহাইয়ের সেই লড়াইয়ের পর ভাশেরোর র্যাঙ্কিং ১৬৪ ধাপ লাফিয়ে ৪০-এ পৌঁছায়, তিনি ATP ট্যুরের মূল পর্বে সরাসরি খেলার যোগ্যতা পান, যা শীর্ষ পর্যায়ের ট্যুরে তাঁর প্রথম পূর্ণ মৌসুমের পথ প্রশস্ত করে। ২০২৬ মৌসুমে ভাশেরো এই সাফল্যের ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রেখেছেন: এপ্রিলে নিজের শহরে অনুষ্ঠিত মন্টে কার্লো মাস্টার্সে সেমিফাইনালে উঠেছেন, গত সপ্তাহে টোকিও টুর্নামেন্টেও শেষ চারে পৌঁছেছেন।
এখন সাংহাইয়ে ফিরে ভাশেরো কি ইতিহাস লেখা চালিয়ে যেতে পারবেন, তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে সফলভাবে মাস্টার্স শিরোপা রক্ষা করতে পারবেন?
(আকা)
শেষ হালনাগাদ: 2026-10-13 18:09
